কলকাতার গড়িয়াহাটের এক পুরোনো দোতলা বাড়ির উপরের ঘরে সকাল হয়েছে। কিন্তু অনন্যা সেনের চোখে-মুখে সেই সকালের জৌলুস নেই। ঘড়িতে সকাল ৭টা। কাঁচা ঘুম চোখে সে উঠে দাঁড়াল, চোখ রগড়াতে রগড়াতে বাথরুমে ঢুকে গেল। একটু পরেই অফিসে বেরোতে হবে।
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ফোনটা খুলতেই দেখল অজস্র বিজ্ঞাপন—“অক্ষয় তৃতীয়ার অফার!”, “আজই কিনুন সোনা!”, “আপনার সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ শুরু হোক আজ!”
সে হালকা বিরক্ত হয়ে ফোনটা রেখে দিল। নিউজ পেপার টা খুলে দেখতে গিয়েও সেই প্রথম পাতা থেকে শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞাপনের মায়া জালে হাঁসফাঁস করে উঠল। অক্ষয় তৃতীয়া—মা বলত, “এদিন নতুন কিছু শুরু করলে সেটা অক্ষয় হয়, চিরস্থায়ী হয়।” ছোটবেলায় এই দিন মানেই ছিল বাবার কাছ থেকে কিছু একটা জিনিস, হয় নতুন বই, নয়তো নতুন জামা আর মায়ের হাতের সুজি খিচুড়ি।
কিন্তু এখন দিনগুলো কেবল কর্পোরেট মিটিং, মেইল আর মাইনে-চিন্তার ঘূর্ণি।
ঠিক সেই সময় ফোনে মায়ের মেসেজ, সকালে ব্যস্ত থাকে বলে বিশেষ কোনো দরকার ছাড়া পারতপক্ষে ফোন করে না মা —
“আজ অক্ষয় তৃতীয়া। নতুন কিছু একটা কিনে নিস। জীবন তোর সামনে পড়ে আছে, আমাদের আশীর্বাদ রইল।”
মেসেজটা একবার দেখে যেন হালকা আলো ছুঁয়ে গেল অনন্যার মনের ভিতর। সকালের মন খারাপ টা যেন নিমেষে উধাও।
দুপুরে অফিসের ক্যান্টিন। সবাই ফোনে ব্যস্ত। কেউ বলছে, “আজকে এক গ্রাম সোনার দাম বেশ ভালো, আই মিন একটু কমেছে, নিয়ে নিচ্ছি।”
“আমি তো অ্যাপে অলরেডি বুক করে ফেলেছি এক গ্রাম সোনা,” মৃদু গলায় জানাল অর্ণব।
স্নিগ্ধা, ওর ডেস্ক-পার্টনার, হেসে বলল, “তুই কী নিচ্ছিস আজ অনু? সোনা? না ক্রিপ্টো?”
অনন্যা হেসে বলল, “সোনা কিনে কী হবে? এখন তো নিজের ভবিষ্যৎটাই টিকিয়ে রাখতে পারি না।”
স্নিগ্ধা মুচকি হেসে বলল, “তুই না একদম বুড়িদের মতো কথা বলিস। একটু ভাবনায় পজিটিভ হ। অক্ষয় তৃতীয়া না আজ!”
অনন্যা হাসল, কিন্তু ভিতরে ভিতরে চিন্তা করছিল। বাবা তিন মাস ধরে অসুস্থ, চিকিৎসার খরচ ওর হাতেই। চাকরিটা ভালো হলেও সঞ্চয় খুবই কম। সোনা কেনা দূরের কথা, মাসের শুরুতেই এডুকেশন লোনের ই এম আই-ই গলায় ছুরি হয়ে দাঁড়ায়।
সন্ধেবেলা ছাদে বসে হালকা বাতাসে চুল উড়তে উড়তে সে নিজের পুরোনো গুগল ড্রাইভে ঢুকল। এক সময় সে ওয়েব ডেভেলপার হতে চাইত। কিন্তু আর্থিক অসঙ্গতি তে ইঞ্জিনিয়ারিং না করে অনার্সের পরে খুঁজে নিতে হয়েছিল একটা ঠিকঠাক চাকরি। কিন্তু সুযোগ পেলেই চেষ্টা করত কিছু শেখার, কিছু অনলাইন কোর্সে ভর্তি হবে ভেবেছিল। কিন্তু চাকরির চাপে, আর বাবার অসুস্থতায় সব বন্ধ করে দিতে হয়েছিল
হঠাৎ সে দেখল—একটি কোর্স প্ল্যাটফর্মে সাবস্ক্রিপশন মেইল এসেছে— কোডিং উইথ পাইথন।
“আজ অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে পান ৫০% ছাড়। নিজের ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ করুন আজ।”
যদিও অফারের পরেও বেশ দাম কোর্স টার।
মনে হলো—সবার মতো সোনা না হোক, সে যদি তার নিজের “স্বপ্নে” আজ বিনিয়োগ করে?
সে ব্যাঙ্ক অ্যাপ খুলে ব্যালান্স চেক করল। সামান্য টাকা আছে। মাসটা একটু কষ্ট করে চললে—হতে পারে।
সে নিঃশব্দে সাবস্ক্রিপশন বাটনে ক্লিক করল।
পরদিন থেকেই শুরু হলো অনন্যার নতুন রুটিন। অফিস শেষ করে বাড়িতে ফিরে খাওয়ার পর, রাত ১০টা থেকে —শুধু কোডিং আর প্র্যাকটিস।
প্রথমে খুব কষ্ট হচ্ছিল। মন বসত না। ঘুম পেত। ক্লান্ত লাগত। মনে হতে লাগলো না আর পারবে না সে।
কিন্তু প্রতি রাতে মায়ের বলা কথাগুলো মনে পড়ত—
“যে রোজ নিজের জন্য কিছু শেখে, সে কখনো হারে না।”
একসময় সেই কোড লাইনে সে সৌন্দর্য খুঁজে পেল। নিজে ছোট ছোট ওয়েব অ্যাপ বানাতে শুরু করল। নিজের ল্যাপটপে, আর গিটহাবে আপলোড করে রাখত।
ছয় মাস পর, এক সন্ধ্যায় মেইল চেক করছে, হঠাৎ একটা মেইল পেল। তার বানানো একটি ‘প্রোডাক্টিভিটি টুল’ হ্যাকারনিউজে ফিচার হয়েছে। অনেকেই তা ব্যবহার করছে।
তারপরেই কিছুদিনের মধ্যেই আসে প্রথম অফার—একটি ইউএস-ভিত্তিক রিমোট টেক স্টার্টআপ তার ইন্টারভিউ নিতে চায়। ভালই যায় সেটা। তবে সব শেষে ওর ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি না থাকায় ওনারা বেশ আশাহত হন। তাই বিশেষ কিছু আশা করে না অনন্যা।
এক সপ্তাহ পরে সে অফার লেটার পায়—তার বর্তমান চাকরির দ্বিগুণ বেতনের রিমোট জব!
সে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল বারান্দায়। চারপাশে আতশবাজির শব্দ— কি একটা খেলায় মোহনবাগান চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তারই উৎসব করছে ছেলে ছোকরাদের দল। আর তার মনের ভিতর বাজছে একটাই কথা—
“এই হলো আমার সোনার পুঁজি। আমার অক্ষয় তৃতীয়া।”
অনন্যা এখন নিজেই একটি ছোট টিম লিড করে। ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট বুক করেছে কলকাতায়। কিছুদিন হল বাবা মা কে নিয়ে এসেছে এখানে। বাবা এখন অনেকটাই সুস্থ, মায়ের হাসির রেখা গভীর হয়েছে, সে দেখতে পায় এক শান্তির নীরবতা।
এক বছর কেটে গেছে। আজ আবার অক্ষয় তৃতীয়া।
অনন্যা আজ নিজের টেবিলে এক ফ্রেমে পুরোনো স্ক্রিনশট রেখে দিয়েছে—
তার প্রথম কোড করা অ্যাপের হোম স্ক্রিনে লেখা—
“Let this be my beginning. Let it last forever”
মা এসে বললেন, “এই বছর সোনা কিনবি না?”
অনন্যা হেসে বলল, “আমি আজও কিনেছি মা—একটা নতুন কোর্স। এবার ডেটা সায়েন্স!”
মা কিছুটা অবাক হয়েই চুপ করে তার দিকে তাকালেন। চোখের কোণে অশ্রু।
অনন্যা নিজের মনে মনে ভাবল—
“এই গল্পটা কখনও বন্ধ হবে না। কারণ আমি নিজেকে এভাবেই ‘অক্ষয়’ করে তুলব।”
©️কলমে_অয়ন
রচনার তারিখ: ১ মে ২০২৫















